বাউল গানের কিংবদন্তী শাহ আবদুল করিম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই থানার উজানধল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।দারিদ্র ও জীবন সংগ্রামের মাঝে বড় হওয়া বাউল শাহ আবদুল করিমের সঙ্গীত সাধনার শুরু ছেলেবেলা থেকেই। ছোট বেলা দূরন্তপনার কথা তিনি গানে গানে বলে গেছেন
গান:
হুরু থাকতে যাইতাম নানার বাড়ি,
ভুলতে না পারি..
হুরু থাকতে যাইতাম নানার বাড়ি!..

খাইতাম কতো মজার খানা,
আজো তা ভুলতে পারি না!
বড় মামীরে ডাকিতাম শাশুরি..
ভুলতে না পারি,
হুরু থাকতে যাইতাম নানার বাড়ি!

আগে তো বেশি বুঝতাম না,
লৈজ্জা-শরম ভাবিতাম না,
ময়নার মা’র বড়োই করতাম চুরি!..
আম-কাঠাঁল-আনারস খাইতাম,
আমি বেশি যন্ত্রনা দিতাম,
লাল ভাই’র লগে করতাম মারামারি!
ভুলতে না পারি..
হুরু থাকতে যাইতাম নানার বাড়ি!..

বাউল সম্রাটের প্রেরণা তার স্ত্রী আফতাবুন্নেসা। তিনি তাকে আদর করে ডাকতেন ‘সরলা’। তাঁর একমাত্র ছেলে শাহ নূর জালাল।
ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি তার গান কথা বলে সকল অন্যায়,অবিচার,কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরূদ্ধে। তিনি তার গানের অনুপ্রেরনা পেয়েছেন প্রখ্যাত বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ, পুঞ্জু শাহ এবং দুদ্দু শাহ এর দর্শন থেকে। যদিও দারিদ্র তাকে বাধ্য করে কৃষিকাজে তার শ্রম ব্যায় করতে কিন্তু কোন কিছু তাকে গান সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিনি আধ্যাত্নিক ও বাউল গানের দীক্ষা লাভ করেছেন কামাল উদ্দীন, সাধক রশীদ উদ্দীন, শাহ ইব্রাহীম মাস্তান বকশ এর কাছ থেকে। তিনি শরীয়তী, মারফতি, নবুয়ত, বেলায়া সহ সবধরনের বাউল গান এবং গানের অন্যান্য শাখার চর্চাও করেছেন।

মাত্র আট দিন নাইটস্কুলে লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন আব্দুল করিম। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও, তিনি ছিলেন স্ব শিক্ষিত। জীবদ্দশায় কালনী নদীর তীরে বসে তিনি রচনা করেছেন অসংখ্য বাউল গান। ভাটিবাংলার অপার সৌন্দর্য তিনি ধারণ করেছিলেন তার হৃদয় সত্তায়। সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা তাকে তিলেতিলে পীড়ন করতো। তার গানে গ্রামবাংলার জীবনচিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন সুনিপুণভাবে। গানে গানে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মানুষের আত্মার আত্মীয়, অকৃত্রিম দেশপ্রেমিক ও গণ মানুষের শিল্পী।
স্বল্পশিক্ষিত বাউল শাহ আব্দুল করিম এ পর্যন্ত প্রায় দেড় সহস্রাধিক গান লিখেছেন এবং সুরারোপ করেছেন। বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে তাঁর ১০টি গান ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে।

কিশোর বয়স থেকে গান লিখলেও কয়েক বছর আগেও এসব গান শুধুমাত্র ভাটি অঞ্চলের মানুষের কাছেই জনপ্রিয় ছিল। সাম্প্রতিককালে এ সময়ের বেশ কয়েকজন শিল্পী বাউল শাহ আব্দুল করিমের গানগুলো নতুন করে গেয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করলে তিনি দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন। অসংখ্য জনপ্রিয় গানের মাধ্যে কিছু গানের নাম নিচে দিলাম।
গান:
=বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে
=আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম
=গাড়ি চলে না
=আমি কূলহারা কলঙ্কিনী
=কেমনে ভুলিবো আমি বাঁচি না তারে ছাড়া
=কোন মেস্তরি নাও বানাইছে
=কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু
=বসন্ত বাতাসে সইগো
এছাড়াও অসংখ্য জনপ্রিয় গান আছে।
শাহ আব্দুল করিমের সুর করা গানের সংখ্যা ১৫শ’র বেশি।

বাউল শাহ আবদুল করিমের এ পর্যন্ত ৬টি গানের বই প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলো হলো-
১.আফতাব সংগীত, ২.গণ সংগীত, ৩.কালনীর ঢেউ, ৪. ভাটির চিঠি, ৫. কালনীর কূলে এবং ৬. দোলমেলা।
সম্প্রতি সিলেট জেলা মিলনায়তনে তাঁর রচনাসমগ্র “অমনিবাস”-এর মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে।

পুরস্কার :
১.বাউল শাহ আব্দুল করিম ২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন।
২. দ্বিতীয় সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস অনুষ্ঠানে বাউল সম্রাটকে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।
৩. ২০০০ সালে কথা সাহিত্যিক আবদুর রউফ চৌধুরি পদক পান।
সংগীত সাধনায় অসাধারণ অবদানের জন্য একুশে পদকসহ বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আড়াইশ’র বেশি পদক ও সম্মাননা পেয়েছেন বাউল সম্রাট।

বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম জীবনের মায়া ত্যাগ করে। হাজারও ভক্ত অনুরাগী কে কাঁদিয়ে
২০০৯ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।

লেখা: জয়নব হাসার ইথার

রিপ্লাই দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here