রহস্যজনক কোনো কারনে অগ্নিকাণ্ডের মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন আসেনা!

শেয়ার করুন:


রহস্যের অদৃশ্য জালে যেনো আটকে আছে দেশে ঘটে যাওয়া বড় বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম। বছরের পর বছর পার হলেও যেনো শেষ হয় না মামলাগুলোর তদন্ত। শুধু আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন ফ্যাশনের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অভিযোগপত্র জমা পড়ার নজির থাকলেও আর কোনও ঘটনার মামলাতেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি। যদিও আশুলিয়ার ঘটনার মামলায় সাক্ষীর অভাবে বিচারকাজ আজও শেষ হয়নি। ফলে বড় বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলোর কোনও মামলার আসামির বা দোষীদের শাস্তির নজির নেই।
রাজনৈতিক ছত্রছায়া, অবহেলা, অবৈধ লেনদেন, দায়িত্বহীনতা, সমন্বহীনতা ও অসাধু লোকজনের ঐক্যবদ্ধতা এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, আমাদের দেশে মৃত্যু বা দুর্ঘটনার কোনও মূল্য নেই। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যাদের অবহেলা ও অপরাধের কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। এছাড়া কেউ কেউ রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকার কারণে পার পেয়ে যাচ্ছে। যেমন পুরান ঢাকায় প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের ঐক্যবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। এসব মামলা তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা ও অসহযোগিতামূলক আচরণও মামলার প্রতিবেদন দাখিলে বড় প্রতিবন্ধকতা। ওইসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে- তিতাস, রাজউক, আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তকারী কর্মকর্তা, বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিস্ফোরক অধিদপ্তর। পুরান ঢাকায় নিমতলী ও চুড়িহাট্টায় বড় ধরনের যে দুটা ট্রাজেডি ঘটলো, সেখানে আজও কেমিক্যালের অবৈধ ব্যবসা চলছে। বিষয়টি এমন যে- আরও একটি ট্রাজেডি না ঘটা পর্যন্ত এসবে আমরা আর মনিটরিং করছি না!
এফআর টাওয়ারের মামলার তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, এফআর টাওয়ারের মামলাটির তদন্তকাজ প্রায় শেষের দিকে রয়েছে। এখন রাজউকের কাছ থেকে কিছু রিপোর্ট পেলেই আমরা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারবো। ইতোমধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগ থেকে এই অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আমরা সংগ্রহ করেছি। এখন রাজউক আমাদের ডাকে সাড়া দিলেই মামলাটির কুলকিনারা করতে পারবো। তদন্ত করতে গিয়ে আমরা অবহেলার বিষয় খুঁজে পেয়েছি, তদন্ত প্রতিবেদনে যা উল্লেখ করা হচ্ছে।
এদিকে চকবাজারে চুড়িহাট্টা ট্রাজেডির মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চকবাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কবির হাওলাদার বলেন, এই মামলার তদন্ত কার্যক্রম কিছু বাকি আছে। ওই ঘটনায় দগ্ধ হয়ে মোট ৭০ জন নিহত হয়েছিলেন। তার মধ্যে ৪ জনের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনরা নিয়ে যায়। বাকি ৬৬ জনের মরদেহের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট আমাদের হাতে এসেছে। আশা করছি খুব শিগগির মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে পারবো। চেষ্টা করছি এ বছরের মধ্যেই মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে। তবে এখনও কয়েজেন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ বাকি আছে, তাদের সাথে যোগাযোগ করছি।

উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা
বনানীর আহমেদ টাওয়ারে আগুন: সবশেষ আজ রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) আলোচিত বনানীর এফআর টাওয়ারের পাশের ভবন আহমেদ টাওয়ারের ১৫তলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও ওই একই সড়কের বসতি হরাইজন টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটা ঘটেছিল।
নারায়ণগঞ্জে মসজিদে আগুন: চলতি বছরের গত ৫ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ শহরের ফতুল্লার পশ্চিমতল্লা এলাকায় একটি মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় ৩৭ জন দগ্ধ হয়েছিল। পরে ওই ঘটনায় ৩৩ জন মুসল্লির মারা যান। এই ঘটনায় দগ্ধ ৩ জন এখনও শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বনানী এফআর টাওয়ার: ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ২৫ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন প্রায় ৭০ জন।
চকবাজারের চুড়িহাট্টা: ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ওয়াহেদ ম্যানশনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। জানা যায়, সেখানে কেমিক্যালের গোডাউন থাকায় আগুন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এ অগ্নিকাণ্ডে ৭০ জন নিহত হন। আহত হন অনেকেই।
নিমতলী: ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীর নবাব কাটরায় রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের গুদামে ভয়াবহ বিস্ফোরণে নিহত হন নারী ও শিশুসহ ১২৪ জন।
তাজরীন ফ্যাশন: ২০১২ সালে ২৪ নভেম্বর তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১১১ জন নিহত হন। ঢাকা মহানগরীর উপকণ্ঠ আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় অবস্থিত তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেড কারখানায় ভয়ানক এ দুর্ঘটনায় নয়তলা ভবনের ছয়তলা ভস্মীভূত হয়ে যায়। এতে সরাসরি আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যায় ১০১ জন পোশাকশ্রমিক। আগুন থেকে রেহাই পেতে উপর থেকে লাফিয়ে পড়ে মৃত্যু হয় আরও ১০ জনের।
গার্মেন্টস: ২০১২ সালে গরীব অ্যান্ড গরীব গার্মেন্টসে লাগা আগুনে নিহত হন ২১ জন। এছাড়া হামীম গ্রুপের অগ্নিকাণ্ডে ২৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৩ সালের ২৮ জুন রাজধানীর মোহাম্মদপুরে স্মার্ট এক্সপোর্ট গার্মেন্টস লিমিটেডে আগুনে পুড়ে ৭ নারী পোশাকশ্রমিক নিহত হন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে গার্মেন্টসগুলোতে আগুন লাগার খবর পাওয়া যায়।
বস্তি: ২০১৭ সালের ১৫ মার্চ দিনগত রাত ২টা ৫০ মিনিটে মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। এর আগে ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর হাজারীবাগ বেড়িবাঁধ সংলগ্ন শিকদার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশে বউবাজার বস্তিতে আগুনে পুড়ে যায় ৫০টি ঘর। এছাড়া ২০১৮ সালের ১৯ নভেম্বর একই বস্তিতে লাগা আগুনে প্রাণ হারান ১১ জন। একই বছর ১২ মার্চ রাজধানীর পল্লবীর ইলিয়াস আলী মোল্লা বস্তিতে আগুন লাগে। অগ্নিকাণ্ডে বস্তির প্রায় ৫ হাজার ঘরের সব পুড়ে যায়। এছাড়া মাঝে মাঝেই বস্তিগুলোতে অগ্নিকাণ্ড ঘটতে থাকে।

ফায়ার সার্ভিসের গত এক যুগের হিসাব
সম্প্রতি ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০০৮ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১২ বছরে দগ্ধ হয়ে মারা যান ১ হাজার ৬৯৮ জন। নিচে সেই পরিসখ্যান উল্লেখ করা হলো, ২০১৯ সালে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে প্রায় ২২ হাজার ৩৫২টি, নিহত হয়েছেন ১৮৭ জন, আর আহত প্রায় ৩৯১ জন। ২০১৮-তে ১৯ হাজার ৬৪২টি অগ্নি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১৩০ জন। ২০১৭ সালে ১৮ হাজার ১০৫টি অগ্নি দুর্ঘটনায় মারা যান ৪৫ জন। ২০১৬-তে ১৬ হাজার ৮৫৮টি অগ্নি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৫২ জন। ২০১৫ সালে ১৭ হাজার ৪৮৮টি অগ্নি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৬৮ জন। ২০১৪-তে ১৭ হাজার ৮৩০টি অগ্নি দুর্ঘটনায় ৭০ জন প্রাণ হারান। ২০১৩ সালে অগ্নি দুর্ঘটনার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৯১২তে। নিহত হন ১৬১ জন। ২০১২ সালে ১৭ হাজার ৫০৪টি অগ্নি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ২১০ জন। ২০১১ সালে ১৫ হাজার ৮১৫টি অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন ৩৬৫ জন। ২০১০ সালে ১৪ হাজার ৬৮২টি অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ৬৩ জন। ২০০৯ সালে ১২ হাজার ১৮২টি অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন ১১৮ জন। ২০০৮ সালে ৯ হাজার ৩১০টি অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন ২২৯ জন, আহত হন ১ হাজার ৩৫৬ জন।


শেয়ার করুন:

রিপ্লাই/মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন