লাইলাতুল কদর যে তাৎপর্যপূর্ণ রাত এটা আমরা সকলেই জানি বিভিন্ন লেকচার, ওয়াজ কিংবা পড়াশুনার মাধ্যমে। বেশ আর কম সবারই জানা আছে লাইলাতুল কদর, মে’রাজ ও লাইলাতুল বরাত সম্পর্কে। তো এখানে লাইলাতুল কদর নিয়ে গতানুগতিক আলোচনার বাহিরে এসে যে বিষয়টা নিয়ে বলতে চাই তার উদ্যেশ্য হলো- আমরা কি লাইলাতুল কদর শুধু নামে মাত্র নামাজ আর রাত জেগে থাকার মাধ্যমে সীমাবদ্ধ রাখবো নাকি বাস্তব জীবনে তা প্রতিফলিত করবো?

আমাদের দেশে এই লাইলাতুল কদরসহ অন্য ইবাদতের রাতগুলো বিভিন্নভাবে পালিত হয়ে আসছে। অযথা খানাপিনার বিলাসি আয়োজন থেকে শুরু করে বর্তমানে মসজিদে আলোকসজ্জা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। এমনকি অনেকটা উৎসবেও পরিণত হয়েছে। অথচ লাইলাতুলকদর এমন এক মহিমান্বিত। গৌরবময়। বরকতময়। একই সাথে হাজার মাসের চাইতেও উত্তম মর্যাদাপূর্ণ রাত বলে জানি, যে রাতে পবিত্র কোরআন নাযিল করা হয়েছে।

কদরের এই রাতে কুরআন নাযিল হওয়ার কারণে যে রাতের শ্রেষ্ঠত্ব, গুরুত্ব এবং মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। সেই রাতের আমল ও কুরআনের বিধিনিষেধ মেনে চলেই তো মানবজাতির মার্যাদা বৃদ্ধি হওয়ার কথা! কিন্তু আমাদের সমাজের চিত্র তার বিপরীত। আমরা এই লাইলাতুল কদরকে শুধু খানাপিনা, নামাজ আর রাত জাগার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রেখেছি। অথচ এই রাতেই তো সমগ্র দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ কিতাব মানবতার মুক্তির নিদর্শন পবিত্র কোরআন নাযিল করা হয়েছে। যাতে মানুষ এই কোরআনের বিধিমালা জীবনে বাস্তবায়ন করে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ লাভ করতে পারে।

এই রাত কেন শ্রেষ্ঠ হলো তার কোন খবর আমাদের নেই! আমরা আছি রাতের আমেজ নিয়ে। যদি থাকতো তাহলে আমরা আজ কদরের রাতসহ অন্য আরো ইবাদাতের যে রাতগুলো রয়েছে সেগুলো যথাযথ পালনের মাধ্যমে কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত করতাম। কিন্তু এসব আমাদের মাঝে নেই। যেমন জানা নেই। তেমনটা মুসলমানদের সঠিক চর্চাও নেই এসব বিষয়ে।

পবিত্র কোরআনে একটি সূরাও নাযিল করা হয়েছে এই লাইলাতুল কদরের মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে। অথচ এই রাতের মর্যাদা যে কারণে বাড়ানো হলো সেই কুরআন আমরা পড়ি না। ধরি না। এমনকি কুরআনকে বুঝার চেষ্টাও করি না। তো আমরা সফল হবো কোত্থেকে? আমরা কিসের নামাজ, রোজা আর ধর্মকর্ম করি? যেই ধর্মের মূল হলো এই কুরআন। সেই কুরআন অর্থসহ তো দূরের কথা সঠিকভাবে পড়তেও জানি না। আমরা দুনিয়ার জীবনে লোভ লালসায় পড়ে এতোই ব্যস্ত যে এই কোরআনকে পড়ার জন্য। জানার জন্য। একই সাথে মানার জন্য কোন পরিকল্পনা বা সময় বের করতে পারি না।

শুধু কি তাই? আমরা যেখানে শুদ্ধভাবে কুরআন পড়তে জানি না। পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ পড়িনা। ইসলামকে সঠিকভাবে জানি না। তার সাথে অন্যসব বিধিনিষেধও মানি না। সেই আমরাই আবার হুজুগে লাইলাতুল কদরসহ অন্য আরো ইবাদতের রাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ি নামাজ আর ইবাদত করতে। প্রভুকে সন্তুষ্টি করতে। অথচ আমরা কি জানি! এই রাতসহ যে কোন ইবাদতের সাওয়াব তখনই আমলে পরিণত হবে যখন কুরআন ও হাদিসকে জীবনে চলার পাথেয় বা নির্দেশিকা হিসেবে গ্রহণ করা হবে। পরিপূর্ণ মর্যাদা দেওয়া হবে। একই সাথে আমলে পরিণত করা হবে। অন্যথায় রাত জেগে বা অন্য আরো আরো আমল করে কোন ফায়দা বা ফজিলত পাওয়া যাবে না।

তো এতো এতো কথার মূল বক্তব্য হলো আমাদেরকে কোরআন ও হাদিস মুখি হতে হবে। ইসলামের সঠিক অনুসারী হতে হবে। শুধু নামাজ পড়লে। কোরআনকে পড়লে। সম্মান করলে। কিংবা চুম্বন দিয়ে তাকের উপর তুলে রাখলে চলবে না। এগুলো তো মুসলিম হিসেবে দৈনন্দিন কাজ করবেনই উপরন্তু সাথে সাথে আমাদেরকে জানতে হবে কোরআনকে কেন মানবজাতির হেদায়েতের বাণী হিসেবে প্রেরণ করা হলো। কোন কোন উপায় বা পদ্ধতি অবলম্বন করে আমাদের চলতে হবে। একই সাথে এতে মানুষের জন্য কি কি নির্দেশনা রয়েছে তাও জানতে হবে।

কোনটা হালাল আর কোনটা হারাম তা সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে কোরআন ও হাদিসের পরতে পরতে। তা জানার মাধ্যমেই আমাদের জীবনকে পরিচালনা করতে হবে। ইসলামি শরিয়াতের পূর্ণাঙ্গ বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে। রাসুল [ সা.] বলেই দিয়েছেন- ” তোমরা হালালকে হালাল জেনে গ্রহণ করবে আর হারামকে বর্জন করবে। সুতরাং এখানে ফাঁকিবাজি করে নানান অজুহাতে বাঁচার কোন সুযোগ নেই। বরং জেনে আমল করলেই এই লাইলাতুল কদরসহ অন্য আরো রাত কিংবা দিনের ইবাদত কবুলের সহায়ক হবে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ সহজ হবে। তবেই দুনিয়া ও পরকালের জীবনে সফলকাম হওয়া যাবে।

লেখক- মিজান ফারাবী, কবি ও প্রাবন্ধিক।

রিপ্লাই দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here